
সারা দেশে এনজিও ঋণের নামে সুদের দৌরাত্ম্য
মহাজনী চরিত্র ও নিয়ন্ত্রণহীনতায় বিপর্যস্ত সাধারণ মানুষ
সারা দেশে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনাকারী একাধিক এনজিওর বিরুদ্ধে অতিরিক্ত সুদ আদায়, ঋণগ্রহীতাদের ওপর নিপীড়ন এবং মহাজনী চরিত্রে পরিণত হওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব অনিয়ম চলতে থাকলেও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা না থাকায় ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ ও মানবাধিকারকর্মীরা ক্ষুদ্রঋণ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি সংস্থা Microcredit Regulatory Authority (MRA)-এর নীতিমালায় সুদের হার, ঋণ আদায়ের পদ্ধতি ও গ্রাহক সুরক্ষার বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে তার যথাযথ প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না—এমন অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে। ভুক্তভোগীদের দাবি, দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিচালিত বহু এনজিও নীতিমালার সীমা অতিক্রম করে দরিদ্র ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ও অযৌক্তিক সুদ আদায় করছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একসময় গ্রামবাংলায় প্রচলিত মহাজনী সুদ ব্যবস্থা—যেখানে প্রতি মাসে ১০০ টাকার বিপরীতে ২০ টাকা পর্যন্ত সুদ নেওয়া হতো—শোষণমূলক ঋণের প্রতীক হিসেবে পরিচিত ছিল। বর্তমানে অভিযোগ উঠছে, আধুনিক ব্যবস্থার আড়ালে পরিচালিত কিছু সুদি এনজিওর কার্যক্রমে সেই মহাজনী চরিত্রেরই পুনরাবৃত্তি ঘটছে।
ভুক্তভোগীরা এসব ব্যবস্থাকে উল্লেখ করছেন—
“মহাজনী সুদ ব্যবস্থা”
“সুদখোর মহাজন শ্রেণী”
“অত্যধিক সুদে ঋণদাতা”
অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন নামে পরিচালিত কিছু এনজিওর সুদ কাঠামোর সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী মহাজনী ব্যবস্থার স্পষ্ট সাদৃশ্য খুঁজে পাচ্ছেন ঋণগ্রহীতারা।
স্থানীয় সূত্র ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের গবেষণা ও জরিপে উঠে এসেছে—ঋণের কিস্তি ও সুদের অতিরিক্ত চাপ সহ্য করতে না পেরে বহু ঋণগ্রহীতা মানসিক ও শারীরিক নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন।
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে—বিশেষ করে রাজশাহী জেলা ও এর বিভিন্ন উপজেলার বিভিন্ন এলাকায়—এই চাপ ক্রমশ ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। অভিযোগ রয়েছে, এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে পরিবার ভাঙন, সামাজিক অস্থিরতা এবং চরম মানবিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি হচ্ছে। অর্থনৈতিক চাপ ও অনিয়মের বোঝা সহ্য করতে না পেরে অসংখ্য মানুষ মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য হচ্ছেন, যা সমাজে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে। এ ধরনের অনিয়ম ও ভুক্তভোগীদের করুণ দুর্দশা নিয়ে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে একাধিকবার প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
আরও গুরুতর অভিযোগ হলো—MRA-এর অভ্যন্তরে থাকা কিছু দুর্নীতিবাজ ও ঘুষখোর কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহায়তায় মহাজনী চরিত্রের এসব সুদি এনজিও দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম করেও কার্যত পার পেয়ে যাচ্ছে। অভিযোগকারীদের দাবি, অবৈধ সুবিধা গ্রহণের মাধ্যমে কিছু কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট এনজিওগুলোর বিরুদ্ধে তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে গড়িমসি করছেন। ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নীতিমালা ও আইন বাস্তবে কার্যকারিতা হারাচ্ছে।
এর ফলশ্রুতিতে, সুদভিত্তিক এসব এনজিও দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে কার্যত একটি “টাকার মেশিনে” পরিণত করেছে—যা ক্ষুদ্রঋণের সামাজিক, মানবিক ও দারিদ্র্য বিমোচনের মূল উদ্দেশ্যের সম্পূর্ণ পরিপন্থী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সচেতন মহলের মতে, Microcredit Regulatory Authority (MRA) যদি সত্যিই একটি কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে চায়, তবে প্রথমেই নিজেদের ভেতরের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত সুদ আদায়কারী ও মহাজনী চরিত্রের এনজিওগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজন হলে তাদের সনদ বাতিল করাও জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের আশাবাদ—MRA-এর অধীনে থাকা সৎ ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে ক্ষুদ্রঋণ খাতে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠী প্রকৃত সুরক্ষা ও ন্যায়বিচার পাবে।