
দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে জীবিত থেকেও সরকারি কাগজে মৃত ৮৯ বছর বয়স্কা মমিনা বেগম নামে এক বৃদ্ধা। ভুল ভেরিফিকেশন আর দায়িত্বহীন সুপারিশে প্রায় তিন বছর ধরে বন্ধ রয়েছে তার বয়স্ক ভাতা। ভুক্তভোগী পরিবার বলছে—চরম কষ্টে দিন কাটছেন তারা ।
২০২৩ সালের ৯ আগস্ট। দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলা সমাজসেবা অধিদপ্তর সকল ভাতা ভোগীদের ভেরিফিকেশন কার্যক্রম চালায়। সে সময় বিশেষ প্রয়োজনে ঢাকায় অবস্থান করছিলেন পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের তেঁতুলিয়া গ্রামের মৃত মকবুল হোসেনের স্ত্রী, ৮৯ বছর বয়সী বৃদ্ধা মমিনা বেগম। ভেরিফিকেশনের সময় তাকে বাড়িতে না পেয়ে কোনো খোঁজখবর না নিয়েই তৎকালীন ৪, ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মহিলা কাউন্সিলর বাবলি আরা তাকে মৃত দেখিয়ে পৌর মেয়রের কাছে একটি সুপারিশ দেন। সেই সুপারিশের ভিত্তিতে পৌরসভা উপজেলা সমাজসেবা অফিসে কাগজ পাঠালে মমিনা বেগমকে মৃত তালিকাভুক্ত করা হয়। এতে বন্ধ হয়ে যায় তার বয়স্ক ভাতা। কিছুদিন পর বাড়িতে ফিরে বিষয়টি জানতে পেরে ফুলবাড়ী উপজেলা সমাজসেবা অফিসে যোগাযোগ করেন মমিনা বেগম। সেখানে তাকে জানানো হয়—তিনি সরকারি কাগজে মৃত এবং তার বয়স্ক ভাতার কার্ড বাতিল করা হয়েছে। ভাতা পুনরায় চালুর আশায় তিনি তৎকালীন মেয়র ও কাউন্সিলরদের দারে দারে ঘুরলেও কোনো সুরাহা পাননি। পরবর্তীতে সরকার মেয়র ও কাউন্সিলরদের অপসারণ করলে মমিনা বেগম পৌর প্রশাসকের কাছে যান। তৎকালীন পৌর প্রশাসক মুহাম্মদ জাফর আরিফ চৌধুরী তদন্ত করে মমিনা বেগম জীবিত মর্মে একটি প্রত্যয়নপত্র দেন। কিন্তু সেই কাগজ নিয়ে একাধিকবার সমাজসেবা অফিসে গেলেও আজও চালু হয়নি তার বয়স্ক ভাতা।
মমিনা বেগম বলেন, আমার বয়স্ক ভাতাটা চালু হলে আমি অনেক উপকৃত হতাম। এখন খুব কষ্টে দিন কাটাচ্ছি।”
মমিনা বেগমের পুত্রবধূ আমিনা বলেন, আমরা খুব গরিব মানুষ। আমার শাশুড়ি অসুস্থ। তার খাবার আর চিকিৎসার খরচ দিতে পারছি না। আগে যে বয়স্ক ভাতা পেতেন, সেটাই ছিল আমাদের ভরসা। প্রায় তিন বছর ধরে সেটা বন্ধ।”
স্থানীয় এলাকাবাসী জানান, ভোটের সময় ঠিকই কাউন্সিলররা বাড়ি বাড়ি আসে। অথচ খোঁজ না নিয়েই একজন জীবিত মানুষকে মৃত বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটা ঠিক হয়নি।”
ঘটনার বিষয়ে তৎকালীন মহিলা কাউন্সিলর বাবলি আরার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। তার বাড়িতে গেলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
সাবেক ৬ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাসানুজ্জামান জানান, আমি জানি না কীভাবে মমিনা বেগমকে মৃত দেখানো হয়েছে, কার স্বাক্ষরে হয়েছে তাও জানি না। তবে আমি তার ভাতা পূর্ণবহালের চেষ্টা করেছি।”
ফুলবাড়ী উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা,সানোয়ার হোসেন বলেন,“আমাদের সার্ভারে মমিনা বেগমকে মৃত দেখানো হয়েছে। কী কারণে হয়েছে আমরা জানি না। পৌরসভা থেকে যে কাগজ এসেছে, তার ভিত্তিতেই কাজ করা হয়েছে। আমি তার মৃতুর জায়গাটি পুণরায় সংশোধন করে দিয়েছি। বরাদ্দ আসলে আবার ভাতা চালু করা হবে।
ফুলবাড়ী পৌরসভার প্রশাসনিককর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম জানান, ভাতা ভেরিফিকেশনের কাজ সমাজসেবা অধিদপ্তর করে। তৎকালীন সময় বাবলি আরা নামে একজন কাউন্সিলর তাকে মৃত দেখিয়ে সুপারিশ করেন। সেই কাগজের ভিত্তিতেই মৃত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।”
ভুল কাগজ আর সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে প্রায় তিন বছর ধরে সরকারি বয়স্ক ভাতা থেকে বঞ্চিত ৮৯ বছরের এক বৃদ্ধা। স্থানীয়দের প্রশ্ন—এই অবহেলার দায় কার? দ্রুত ভাতা চালু ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি এলাকাবাসীর।