👉’’ হঠাৎ করে ভারত–আমেরিকার নতুন খেলা ’’👈
""ভারত–আমেরিকার নতুন সমীকরণ: দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে পরিবর্তনের শুরু কি বাংলাদেশ দিয়ে হবে ""
বিশেষ প্রতিনিধিঃ-দৈনিক বাংলার মুক্তকন্ঠ.৭১
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি এখন আর আগের মতো সরল নয়। কূটনৈতিক সৌজন্য, প্রতিবেশীসুলভ ভাষা কিংবা আনুষ্ঠানিক বন্ধুত্বের আড়ালে চলছে গভীর কৌশলগত প্রতিযোগিতা। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও পাকিস্তানের স্বার্থের সংঘাতে এই অঞ্চলের প্রতিটি দেশ এখন একটি সম্ভাব্য ‘মাঠ’। আর সেই মাঠের কেন্দ্রে ক্রমশ চলে আসছে বাংলাদেশ।
সম্প্রতি ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদী বলেছেন, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ভারতের কোনো উদ্বেগ নেই। বরং তিনি ঢাকার সঙ্গে “ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের” কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু বাস্তবতার দিকে তাকালে এই বক্তব্যকে স্বস্তিদায়ক নয়, বরং প্রশ্নবিদ্ধ বলেই মনে হয়।
কারণ কথায় উদ্বেগ নেই, কিন্তু কাজে দেখা যাচ্ছে ব্যাপক সামরিক প্রস্তুতি।
বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন শিলিগুড়ি করিডোরে—যাকে ভারতের নিরাপত্তার ‘চিকেন নেক’ বলা হয়—নজিরবিহীন তৎপরতা শুরু হয়েছে। পাঁচটি পরিত্যক্ত বিমানঘাঁটি পুনরায় সচল করা হচ্ছে। বঙ্গোপসাগরে নজরদারি বাড়াতে পশ্চিমবঙ্গের হলদিয়ায় নতুন নৌঘাঁটি তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এগুলো কোনো রুটিন মহড়া নয়; এগুলো স্পষ্টতই কৌশলগত প্রস্তুতি।
প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই ওঠে—যদি বাংলাদেশ নিয়ে ভারতের কোনো উদ্বেগই না থাকে, তবে এই বাড়তি প্রস্তুতির প্রয়োজন কেন?
জেনারেল দ্বিবেদীর আরেকটি মন্তব্য আরও তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ‘ক্ষণস্থায়ী’। এটি কোনো নিরীহ বিশ্লেষণ নয়; এটি রাজনৈতিক বার্তা। এর অর্থ, দিল্লি এই সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছে না। বরং তারা মনে করছে, এখানে একটি পরিবর্তন অনিবার্য—এবং সেই পরিবর্তন ভারতের কৌশলগত হিসাবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।
এই উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে বাংলাদেশের সামরিক ও কূটনৈতিক অবস্থান।
চীনের অর্থায়নে বাংলাদেশে ড্রোন কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ এবং পাকিস্তান থেকে জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান কেনার সম্ভাব্য আলোচনা ভারতের জন্য নিঃসন্দেহে অস্বস্তিকর। এসব পদক্ষেপ কেবল প্রযুক্তিগত সহযোগিতা নয়; এগুলো শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
তবে ভারত প্রকাশ্যে এসব নিয়ে উদ্বিগ্ন নয় বলেই দাবি করছে। এটি কূটনৈতিক কৌশল। কারণ প্রকাশ্যে আপত্তি তুললে ঢাকা আরও বেশি করে বেইজিং ও ইসলামাবাদের দিকে ঝুঁকতে পারে। কিন্তু সীমান্তে ও সমুদ্রে ভারতের যে সামরিক প্রস্তুতি দেখা যাচ্ছে, তা স্পষ্ট করে দেয়—দিল্লি এসব পরিবর্তনকে হালকাভাবে নিচ্ছে না।
এই বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত সার্জিও গোর দিল্লিতে গিয়ে ভারতকে “আমেরিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বন্ধু” বলে যে ঘোষণা দিয়েছেন, তা নিছক সৌজন্য নয়। এটি একটি কৌশলগত ঘোষণা। একই সময়ে ঢাকায় নিযুক্ত নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসনের চীনবিরোধী অবস্থানও স্পষ্ট।
ওয়াশিংটন এখন দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাব ঠেকাতে চায়। আর এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে তারা ভারতকে প্রধান অংশীদার হিসেবে দেখছে। ফলে ভারত–আমেরিকার মধ্যে একটি নতুন কৌশলগত অক্ষ তৈরি হচ্ছে—যার মূল উদ্দেশ্য চীনকে সীমিত রাখা।
এই নতুন অক্ষের মাঝখানে এসে পড়েছে বাংলাদেশ।
দিল্লির কাছে বাংলাদেশ একটি নিরাপত্তা বলয়। বেইজিংয়ের কাছে এটি একটি কৌশলগত প্রবেশদ্বার। ওয়াশিংটনের কাছে এটি চীনবিরোধী নীতির সম্ভাব্য ফ্রন্টলাইন।
অর্থাৎ, বাংলাদেশ এখন আর শুধু একটি স্বাধীন রাষ্ট্র নয়; এটি একটি ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্র।
এখানেই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। একাধিক শক্তির আগ্রহ যেমন বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও সামরিক সহযোগিতার সুযোগ এনে দেয়, তেমনি অতিরিক্ত নির্ভরতা দেশের কৌশলগত স্বাধিকারকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।
বাংলাদেশ যদি এই প্রতিযোগিতায় সচেতন না থাকে, তবে তার নীতিনির্ধারণ ক্রমশ বাইরের শক্তিগুলোর হাতে চলে যেতে পারে। তখন সরকার বদলালেও নীতির মৌলিক দিক বদলাবে না—কারণ তা নির্ধারিত হবে বাইরের কৌশলগত স্বার্থ দিয়ে।
সব মিলিয়ে এটা স্পষ্ট যে দক্ষিণ এশিয়ায় একটি বড় ধরনের পুনর্বিন্যাস শুরু হয়ে গেছে। এটি শুধু ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের বিষয় নয়; এটি একটি বৈশ্বিক শক্তি-সংঘাতের স্থানীয় সংস্করণ।
প্রশ্ন হলো—এই পরিবর্তনের সূচনা কি বাংলাদেশ দিয়েই হচ্ছে?
যদি তাই হয়, তবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি আর কেবল দেশের ভেতরের ভোট, আন্দোলন বা সরকার পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং তা নির্ধারিত হবে দিল্লি, ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের হিসাব-নিকাশের টেবিলে বসে।
এটাই এখন সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।