নিবন্ধনবিহীন অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও কথিত ‘নকল সাংবাদিক’ ইস্যুতে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি) কমিশনারের দফতর থেকে গণবিজ্ঞপ্তি জারি ও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তা প্রত্যাহারের ঘটনা প্রশাসনিক এখতিয়ার, সমন্বয় এবং গণমাধ্যম ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।
গত ২৯ এপ্রিল এসএমপি কমিশনার আবদুল কুদ্দুচ চৌধুরী, পিপিএম স্বাক্ষরিত এক গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জাতীয় অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালা ২০১৭ অনুযায়ী নিবন্ধন ছাড়া অনলাইন নিউজ পোর্টাল পরিচালনা বেআইনি। বিজ্ঞপ্তিতে অভিযোগ করা হয়, কিছু পোর্টাল অনুমোদনহীনভাবে বিভ্রান্তিকর, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও মানহানিকর সংবাদ প্রচার করে জনমনে বিভ্রান্তি এবং রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে।
নির্দেশনায় ১ মে ২০২৬ সন্ধ্যার মধ্যে নিবন্ধনবিহীন সকল দেশি-বিদেশি পোর্টাল ডোমেইন থেকে অপসারণ করতে বলা হয়। অন্যথায় কঠোর আইনগত ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।
তবে আল্টিমেটামের মেয়াদ শেষ হওয়ার ২৪ ঘণ্টা আগেই, ৩০ এপ্রিল আরেক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে পূর্বের নির্দেশনা বাতিল করা হয়। প্রত্যাহারের কারণ সম্পর্কে এসএমপির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
ঘটনাটি প্রকাশের পর গণমাধ্যম ও আইন অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে পুলিশের এখতিয়ার প্রসঙ্গ। জাতীয় অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালা অনুযায়ী নিবন্ধন, তদারকি ও ব্যবস্থা গ্রহণের মূল দায়িত্ব তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন বিটিআরসি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে কারিগরি ব্যবস্থা নিয়ে থাকে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, “ফৌজদারি অপরাধ সংঘটিত হলে পুলিশ মামলা করতে পারে। কিন্তু নীতিমালা বাস্তবায়নে সাধারণ নির্দেশনা বা গণমাধ্যম বন্ধের আল্টিমেটাম দেওয়ার এখতিয়ার পুলিশ কমিশনারের নেই। এটি প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতার উদাহরণ।”
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নিবন্ধনবিহীন পোর্টালের তালিকা যাচাই-বাছাইয়ের কাজ মন্ত্রণালয়ে চলমান। তালিকা চূড়ান্ত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নেওয়া হলেও নীতিগত সিদ্ধান্ত মন্ত্রণালয়ই দিয়ে থাকে।
দেশে গত এক দশকে অনলাইন নিউজ পোর্টালের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। তথ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রায় ৪,২০০ পোর্টাল নিবন্ধনের জন্য আবেদন করলেও অনুমোদন পেয়েছে ৪০০টির কিছু বেশি। বাকিগুলো নিবন্ধন ছাড়াই কার্যক্রম চালাচ্ছে।
এই সুযোগে এক শ্রেণির ব্যক্তি সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, ব্ল্যাকমেইল ও অপপ্রচারে জড়াচ্ছে বলে অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি কুদ্দুস আফ্রাদ বলেন, “আসল সংকট নকল সাংবাদিক নয়, নকল গণমাধ্যম। নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ ও স্বচ্ছ করে প্রকৃত সাংবাদিকদের মূলধারায় আনতে হবে। পাশাপাশি অপসাংবাদিকতা বন্ধে প্রেস কাউন্সিলকে শক্তিশালী করা জরুরি।”
গণমাধ্যম বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. সাবরিনা সুলতানা মনে করেন, অনিয়ন্ত্রিত অনলাইন প্ল্যাটফর্ম গুজব ও অপতথ্যের ঝুঁকি বাড়ায়। তবে এর সমাধান ঢালাও বন্ধের নির্দেশনা নয়। তিনি বলেন, “নীতিমালার আলোকে তালিকা ধরে শুনানির সুযোগ দিয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে। পুলিশ, মন্ত্রণালয় ও প্রেস কাউন্সিলের ত্রিপক্ষীয় সমন্বয় ছাড়া টেকসই সমাধান সম্ভব নয়।”
সিলেটের ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত দ্রুত পরিবর্তনের পেছনে অদৃশ্য চাপ আছে কিনা, সে প্রশ্ন তুলেছেন। আবার কেউ কেউ বলছেন, ভুয়া সাংবাদিকদের দৌরাত্ম্য ঠেকাতে যে কোনো সংস্থারই তৎপর হওয়া উচিত, তবে তা আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকে।
তথ্য মন্ত্রণালয়, বিটিআরসি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত পোর্টালের হালনাগাদ তালিকা প্রকাশ। আবেদন নিষ্পত্তির সময়সীমা নির্ধারণ ও কারণসহ প্রত্যাখ্যানের বিধান কার্যকর করা।
পেশাগত অসদাচরণের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি ও শাস্তি নিশ্চিত করা।
কোনটি নিবন্ধিত গণমাধ্যম, তা যাচাইয়ের সহজ উপায় জনগণকে জানানো।
সংশ্লিষ্টদের অভিমত, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতা সমান গুরুত্বপূর্ণ। ভুয়া প্ল্যাটফর্ম বন্ধ করতে গিয়ে যেন মূলধারার সাংবাদিকতা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের সতর্ক থাকতে হবে। একইসঙ্গে প্রশাসনিক যেকোনো সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা ও আইনি ভিত্তি নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে জনআস্থা অটুট থাকে।