ঢাকা ওয়াসার একাধিক বৃহৎ প্রকল্পে দায়িত্বপ্রাপ্ত এক মোস্তাফিজুর রহমানের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে ধারাবাহিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাওয়া, প্রকিউরমেন্ট প্রক্রিয়ায় প্রভাব এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে বিশেষ সুবিধা পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে প্রকৌশলী ইঞ্জিনিয়ার মো. মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে।
ওয়াসায় কর্মরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক প্রকৌশলী, ভুক্তভোগী কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০১৩ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়কালে বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্পে তার ভূমিকা নিয়ে অভ্যন্তরীণভাবে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল।
ওয়াসার বিশ্বস্ত সূত্র মতে, প্রায় ৫,০০০ কোটি টাকা ব্যয়ের পদ্মা পানি সরবরাহ প্রকল্পে ২০১৩ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মো. মোস্তাফিজুর রহমান।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, ওই সময় কিছু ক্রয় কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।
একজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রকৌশলী বলেন—
“পদ্মা প্রকল্প চলাকালে কিছু দরপত্র ও ক্রয় সিদ্ধান্ত নিয়ে ভেতরে ভেতরে আলোচনা ছিল। কিছু সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল বলে আমরা শুনেছি।”
Procurement Division-1: গুরুত্বপূর্ণ ফাইল নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ
এর আগে, ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত Procurement Division-1-এ দায়িত্ব পালন করেন।
এই সময় তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খান-এর সময়কালেই বড় বড় প্রকল্পের ক্রয় কার্যক্রম সম্পন্ন হয়।
ওয়াসার এক ভুক্তভোগী প্রকৌশলী বলেন—
“Procurement Division-এ দায়িত্বে থাকার সময় অনেক গুরুত্বপূর্ণ ফাইল নির্দিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তার মাধ্যমে দ্রুত অনুমোদন পেত। এতে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল।”
সায়েদাবাদ ফেজ-৩: সিনিয়রদের টপকে বড় দায়িত্ব বাগিয়ে নেন এই মোস্তাফিজুর রহমানের যেটা কিনা তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২৪ সালে প্রায় ১৬,০০০ কোটি টাকা ব্যয়ের বিদেশি অর্থায়িত সায়েদাবাদ ফেজ-৩ প্রকল্পে তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
ওয়াসার একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, সিনিয়র কর্মকর্তাদের পাশ কাটিয়ে তুলনামূলক জুনিয়র একজন কর্মকর্তাকে এমন বড় দায়িত্ব দেওয়ায় অভ্যন্তরীণভাবে বিস্ময় তৈরি হয়।
একজন সিনিয়র প্রকৌশলী নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বলেন—
“এই প্রকল্প দেশের অন্যতম বড় প্রকল্প। সেখানে দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে সিনিয়রিটি উপেক্ষা করা হয়েছে বলে আমাদের মনে হয়েছে।”
এই সকল প্রক্রিয়াতে অডিট আপত্তি ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ সব থেকে বেশি পাওয়া যায়। এমনকি প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কিছু নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, কয়েকটি ক্রয় কার্যক্রমে অডিট আপত্তি (Audit Objection) উত্থাপিত হয়েছিল বলে সূত্র জানিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে—
নির্ধারিত ব্যয়ের তুলনায় কিছু ক্ষেত্রে ব্যয় বৃদ্ধি
দরপত্র প্রক্রিয়ায় সীমিত প্রতিযোগিতা
সময়সীমা বৃদ্ধির কারণে অতিরিক্ত ব্যয়
তবে এসব অডিট আপত্তির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি।
দুদক ও মন্ত্রণালয় পর্যায়ের অনুসন্ধান নিয়ে আলোচনা চলমান এমনকি দুদকের অভ্যন্তরীণ সূত্র দাবি করেছে, ওয়াসার কয়েকটি বড় প্রকল্প নিয়ে অতীতে দুদক (ACC) এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পর্যায়ে প্রাথমিক অনুসন্ধানের আলোচনা হয়েছিল।
তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে কি না—তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
দুর্নীতি দমন কমিশন এর একজন সাবেক কর্মকর্তা আক্তার হোসেন বলেন—
“বড় প্রকল্প মানেই নজরদারি থাকে। কিছু বিষয়ে অনুসন্ধানের আলোচনা হয়েছিল বলে শুনেছি, তবে তার ফলাফল জনসমক্ষে আসেনি।”
এই প্রতিবেদনের জন্য কথা বলা তিনজন ভুক্তভোগী প্রকৌশলী প্রশাসনিক বৈষম্যের অভিযোগ তুলেছেন।
একজন বলেন—
“যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার চেয়ে প্রভাব ও সম্পর্ক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—এমন ধারণা অনেকের মধ্যে তৈরি হয়েছে।”
আরেকজন বলেন— “আমরা চাই বিষয়গুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হোক। এতে প্রকৌশলীদের মধ্যে আস্থা ফিরে আসবে।”
সাধারণ নাগরিকের অভিজ্ঞতা বলতে যে রুবেল হক বলেন, ‘প্রকল্প বড়, সেবা এখনো সীমিত’
একজন সাধারণ নাগরিক, যিনি ওয়াসা প্রকল্প সংশ্লিষ্ট এলাকায় বসবাস করেন, সেবার মান নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন।
একজন কর্মজীবী নারী তার অভিজ্ঞতা নিয়ে রুবিনা রহমান বলেন—
“হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের কথা শুনি, কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় প্রত্যাশিত সুবিধা পাই না। মাঠপর্যায়ে কাজের মান আরও ভালো হওয়া দরকার।”
সাবেক এমডির সময়কাল নিয়ে প্রশ্ন
তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খান-এর সময়কালেই ওয়াসার বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়।
সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, ওই সময় কিছু প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে নির্দিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর বিশেষ আস্থা রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই বিষয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা সম্ভব হয়নি।
এমনকি এই বিষয়ে ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও কোন ধরনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এই প্রতিবেদনের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ইঞ্জিনিয়ার মো. মোস্তাফিজুর রহমানের ব্যবহৃত ফোন নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তীতে যুক্ত করা হবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্বচ্ছতা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা অবকাঠামো ও পানি ব্যবস্থাপনা খাতের এক বিশেষজ্ঞ বলেন—
“বহুমূল্যের প্রকল্পে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে দীর্ঘমেয়াদে জনগণের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অডিট পর্যবেক্ষণগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করা জরুরি।”
উপসংহার: তদন্তের দাবি জোরালো
ওয়াসার বৃহৎ প্রকল্পগুলো দেশের পানি সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে দায়িত্ব বণ্টন, প্রকিউরমেন্ট প্রক্রিয়া এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের বিতর্ক কমে আসবে এবং জনগণের আস্থা বৃদ্ধি পাবে।